চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর থেকে রাজস্ব আহরণে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৩১৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। কাস্টমসের দ্বিমুখী আচরণের কারণেই রাজস্ব আহরণ কমেছে বলে দাবি বন্দরের আমদানিকারকদের। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কাস্টমস বলছে, কম শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানির কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৭৪০ কোটি টাকা। সে হিসেবে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ কোটি ৯ লাখ টাকা, এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৪৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আগস্টের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ কোটি ৮৯ লাখ টাকার বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৪৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা ৫৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকার বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৫৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। অক্টোবরের লক্ষ্যমাত্রা ৬২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৭৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। নভেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা ৬৫ কোটি ১৯ লাখ টাকার বিপরীতে আহরণে হয়েছে ৪৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। আর ডিসেম্বরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৯ কোটি ২১ লাখ টাকা, এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৫৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বন্দর দিয়ে চাল, ডাল, খৈল, ভুসি, ভুট্টা, পেঁয়াজসহ যেসব পণ্য আমদানি হয় তার অধিকাংশই শুল্কমুক্ত। আর বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আমদানি হচ্ছে চাল, কিন্তু সরকার এ পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছে। শুল্ক আহরণে ঘাটতির আরেকটি কারণ হলো ট্রাকের চাকা অনুযায়ী শুল্কায়ন। এ কারণে এক সময় এ বন্দর দিয়ে প্রচুর পরিমাণে ফল আমদানি হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে।’
এছাড়া অধিক শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে বেনাপোলে যে পণ্যটি সাড়ে ৩ ডলার মূল্যে শুল্কায়ন করা হয়, সেই একই পণ্য হিলি স্থলবন্দরে ৫ ডলার মূল্যে শুল্কায়ন করা হয়। এ কারণে আমদানিকারকরা এ বন্দর দিয়ে অধিক শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক জুয়েল হোসেন বলেন, ‘আমদানির জন্য ব্যাংকে এলসি খোলার সময় ডলারের এক রকম দর থাকে, কিন্তু পণ্য বিক্রি করে বিল পরিশোধের সময় ডলারপ্রতি ৩-৪ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।’
আমদানীকৃত পণ্যের ১০ শতাংশ পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অথচ এখানে সব কার্টুন খুলে শতভাগ পণ্য পরীক্ষা করে কাস্টমস। এতে পণ্যের মান খারাপ হয়, ক্ষতির মুখে পড়েন আমদানিকারকরা।’ এ কারণে আমদানিকারকরা এ বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে দাবি করেন এ ব্যবসায়ী।
হিলি স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আ্যসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘দিন দিন এ বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানির পরিমাণ কমছে। বন্দরের রাস্তাঘাটগুলো খুবই জরাজীর্ণ, ব্যাংকগুলো চাহিদামাফিক এলসি খোলে না। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা কাস্টমসে। দেশের সব বন্দর দিয়ে যেভাবে পণ্য আমদানি-রফতানি হবে, শুল্কায়ন হবে একই নিয়মে হিলি স্থলবন্দরেও কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এমন আশ্বাস দিলেও সেই কথার বাস্তবায়ন হয়নি।’
অধিক শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস নানাভাবে হয়রানি করে এমন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘এইচএস কোড চলবে না, এ ভ্যালু চলবে না, বাড়তি ভ্যালুতে শুল্ক দিতে হবে, একই পণ্য আমদানিতে বারবার কেমিক্যাল টেস্ট বা বিএসটিআই টেস্টে পাঠানোর নামে হয়রানি করা হয়। এসব কারণে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি কমে গেছে।’
এক সময় হিলি স্থলবন্দর দিয়ে প্রচুর পরিমাণে পাথর ও কয়লা আমদানি হলেও বর্তমানে তা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘বুড়িমারী ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে এ দুটি পণ্য আমদানি করলে আরোপিত শুল্ক নিয়ে সেগুলো বন্দরের বাইরে রাখা হয়। কিন্তু এখানে বন্দরের অভ্যন্তরে রাখা হয়। এতে বাড়তি খরচ গুনতে হয়।’
রাজস্ব আহরণে ঘাটতি প্রসঙ্গে হিলি কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশের মতো হিলি স্থলবন্দরেও আমদানি-রফতানিতে ধস নেমেছিল। তারপরও দেশে নিত্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে এখানকার ব্যবসায়ীরা আমদানি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যেসব পণ্যের ওপরে রাজস্ব বেশি, সেসব পণ্য এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয় না। এর কারণ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এইচএস কোড ও ভ্যালু নিয়ে সমস্যা তৈরি করে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘বেনাপোল দিয়ে যে পণ্য আমদানি হয়, সেই একই পণ্য হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করলে এইচএস কোড ও ভ্যালুর কারণে হয়রানির শিকার হতে হয়। এ কারণে যেসব পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক রয়েছে, সেসব পণ্য এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয় না। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আহরণ কমে গিয়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।’
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনটিকে কাস্টম হাউজে রূপান্তর করা হলে আমদানির পরিমাণ বেড়ে রাজস্ব ঘাটতি দূর হবে বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী।
অর্থবছরের প্রথমার্ধে রাজস্ব আহরণে ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করে হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল ইসলাম বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম্প্রতি সরকার চাল, পেঁয়াজ, আলু ও মরিচের মতো পণ্যের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। এছাড়া এ বন্দর দিয়ে আমদানীকৃত অধিকাংশ শুল্কযুক্ত পণ্যের মধ্যে জিরা ও কিশমিশ থেকেই বেশি রাজস্ব আসে। এ অবস্থায় আমদানি অব্যাহত থাকলেও কাঙ্ক্ষিত শুল্ক আহরণ সম্ভব হয়নি।’ তবে বর্তমানে বন্দর দিয়ে যেভাবে আমদানি-রফতানি চলছে, তা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে দাবি করেন তিনি।